ভয়ংকর সেই দিনগুলো: ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ও জেনারেশন জেড (Gen Z)
হঠাৎ সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলেন আপনার স্মার্টফোনে কোনো সিগন্যাল নেই, ওয়াইফাই কাজ করছে না, মেসেঞ্জার বা টিকটক পুরোপুরি নিশ্চুপ! আপনার কি মনে হবে না যে আপনি এক নিমিষেই আদিম যুগে ফিরে গেছেন? আপনার বুক কি একটু খালি খালি লাগবে না?
ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ও জেনারেশন জেড (Gen Z)
বর্তমান যুগের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো প্রযুক্তি নির্ভরতা। আজ আমরা কথা বলব ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ও জেনারেশন জেড (Gen Z) নিয়ে এবং জানার চেষ্টা করব কীভাবে এই ডিজিটাল জেনারেশন ভার্চুয়াল দুনিয়া ছাড়া নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে।
আমরা সবাই জানি, বর্তমান যুগটা পুরোপুরি ইন্টারনেটের হাতের মুঠোয়। কিন্তু যখনই দেশে বা বিশ্বে কোনো কারণে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ হয়ে যায়, তখন সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ে আমাদের তরুণ সমাজ। এই যে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ও জেনারেশন জেড (Gen Z) এর এক অদ্ভুত সংঘাত, এটা আসলে আমাদের অনেক কিছু ভাবিয়ে তোলে। বয়োজ্যেষ্ঠরা যেখানে খবরের কাগজ বা রেডিও শুনে সময় কাটাতে পারেন, সেখানে এই প্রজন্মের তরুণদের কাছে মনে হয় যেন তাদের অক্সিজেন লাইন কেউ কেটে দিয়েছে! তবে অবাক করা বিষয় হলো, সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন ঘটনায় দেখা গেছে যে, ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ও জেনারেশন জেড (Gen Z) এর এই লড়াইয়ে তরুণরা শুধু হতাশ হয়েই বসে থাকেনি, বরং অফলাইনেও তারা নিজেদের মধ্যে দারুণভাবে সংগঠিত হওয়ার এক অভাবনীয় সাহস দেখিয়েছে। ইন্টারনেটহীন এক পৃথিবীতে বেঁচে থাকার এই চ্যালেঞ্জ তাদের নতুন করে চিনতে শিখিয়েছে।
আমাদের আশেপাশে প্রায়ই একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খায়, আর অনেকেই গুগলে সার্চ করেন, generation z meaning in bengali লিখে। সোজা বাংলায়, জেন জি মানে কি তা বুঝতে হলে আপনাকে একটু পেছনের দিকে তাকাতে হবে। জেনারেশন জি বা সংক্ষেপে জেন জি (Gen Z) হলো সেই প্রজন্ম, যাদের জন্ম ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে শুরু করে ২০১০-এর দশকের শুরুর দিকে। গবেষকদের মতে, সাধারণত ১৯৯৭ সাল থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্মগ্রহণকারী ছেলেমেয়েদেরকেই জেন জেড বলা হয়। এরা মূলত আমাদের আগের জেনারেশন এক্স বা মিলেনিয়ালদের সন্তান। মজার ব্যাপার হলো, এই প্রজন্মের আরেকটি জনপ্রিয় নাম হচ্ছে ‘জুমার’ (Zoomer) বা ‘অভয় প্রজন্ম’।
জেনারেশন জি এর সদস্যরা হলো পৃথিবীর ইতিহাসের প্রথম প্রজন্ম, যারা একেবারে ছোটবেলা থেকেই ইন্টারনেট, স্মার্টফোন আর পোর্টেবল ডিজিটাল প্রযুক্তির সাগরে হাবুডুবু খেয়ে বড় হয়েছে। এদেরকে বলা হয় “ডিজিটাল নেটিভস”। জাপান বা অন্যান্য দেশে এদের “নিও-ডিজিটাল নেটিভস” বলেও ডাকা হয়, কারণ এরা শুধু টেক্সট বা কথায় সীমাবদ্ধ নেই; ভিডিও কল, টিকটক, রিলস আর সিনেমা এদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু এই ডিজিটাল আশীর্বাদের একটা অভিশাপও আছে। গবেষকরা দেখেছেন, স্ক্রিন টাইমের নেতিবাচক প্রভাব ছোট শিশুদের চেয়ে এই প্রজন্মের কিশোর-কিশোরীদের ওপর সবচেয়ে বেশি পড়ছে। ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ও জেনারেশন জেড (Gen Z) এর সম্পর্ক তাই এত বেশি স্পর্শকাতর। ইন্টারনেট না থাকলে এদের মনে হয় জীবনের একটা বড় অংশ যেন হারিয়ে গেছে।
পূর্ববর্তী প্রজন্মের তুলনায়, জেনারেশন জি-এর সদস্যরা একটু ভিন্ন ধাঁচের। তারা জীবনটাকে একটু ধীরগতিতে চালাতে পছন্দ করে। শুনলে হয়তো অবাক হবেন, কিন্তু পরিসংখ্যানে দেখা গেছে (বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে), এই প্রজন্মের মধ্যে মাদকদ্রব্য সেবনের হার আগের প্রজন্মের চেয়ে কম। এরা ১৯৬০-এর দশকের সমবয়সীদের তুলনায় যেকোনো তৃপ্তি বা আনন্দকে ভবিষ্যতের জন্য জমিয়ে রাখতে (Delayed Gratification) অনেক বেশি দক্ষ।
তবে, তাদের মনের ভেতর অন্য এক যুদ্ধ চলে। জেনারেশন জি-এর কিশোর-কিশোরীরা তাদের পড়াশোনা, ক্যারিয়ার এবং চাকরি নিয়ে প্রচণ্ড পরিমাণ দুশ্চিন্তায় ভোগে। এর পাশাপাশি, ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ও জেনারেশন জেড (Gen Z) নিয়ে যখনই কথা হয়, তখন তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকটি এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। এই প্রজন্মের মধ্যে বিষণ্ণতা, উদ্বেগ এবং ঘুমে ব্যাঘাতের সমস্যা অনেক বেশি। এমনকি, তাদের মধ্যে এলার্জির প্রকোপও সাধারণ মানুষের তুলনায় বেশি দেখা যায়। তবে ভালো দিকটি হলো, এরা রোগ ও মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপারে আগের যেকোনো প্রজন্মের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। তারা তাদের সমস্যাগুলো নিয়ে খোলামেলা কথা বলতে ভয় পায় না।
বিশ্বজুড়ে এখন একটি বড় আলোচনার বিষয় হলো, এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা বই পড়ার চেয়ে ইলেকট্রনিক ডিভাইসে বেশি সময় ব্যয় করছে। এর ফলে তাদের মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা (Attention span) দিন দিন কমে যাচ্ছে, শব্দভাণ্ডার সীমিত হয়ে পড়ছে এবং একাডেমিক পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটছে। যখন হঠাৎ করে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ও জেনারেশন জেড (Gen Z) এর পরিস্থিতি তৈরি হয়, তখন তারা বাধ্য হয়ে বইয়ের পাতা উল্টায় বা পরিবারের সাথে সময় কাটায়। এই সাময়িক বিরতি তাদের বুঝতে সাহায্য করে যে, স্ক্রিনের বাইরের পৃথিবীটাও কতটা সুন্দর! পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো বা সিঙ্গাপুরে এই প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের পরীক্ষায় বেশ ভালো করলেও, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম তাদের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক অবদানের জন্য একটা বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
এই প্রজন্মের নামকরণের ইতিহাসটাও বেশ রোমাঞ্চকর! ২০০৫ সালে র্যাপার এমসি লার্স সর্বপ্রথম একটি গানে “আইজেনারেশন” (iGeneration) শব্দটি ব্যবহার করেন। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে আইফোন আসার পর এই নামটি বেশ ছড়িয়ে পড়ে। লেখক নীল হাও এদের নাম দিয়েছিলেন “হোমল্যান্ড জেনারেশন”, কারণ তারা আমেরিকার ৯/১১ হামলার পর এক কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে বেড়ে উঠেছে। আর ২০১৮ সালের দিকে ইন্টারনেট মিমের দুনিয়ায় “জুমার” শব্দটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়, যা বেবি বুমারদের নামের অনুকরণে তৈরি।
আরেকটি মজার বিষয় হলো, মিলেনিয়াল এবং জেনারেশন জি-এর মাঝামাঝি সময়ে জন্ম নেওয়া মানুষদের বলা হয় “জিলেনিয়ালস” (Zillennials)। আর জেনারেশন জি এবং পরবর্তী প্রজন্মের (জেনারেশন আলফা) সংযোগস্থলে জন্ম নেওয়াদের বলা হয় “জালফাস” (Zalphas)। এই মানুষগুলোর মধ্যে দুটি প্রজন্মের বৈশিষ্ট্যই দারুণভাবে ফুটে ওঠে।
নারী ও পুরুষ—উভয় ক্ষেত্রেই এই প্রজন্মের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে। বিশ্বব্যাপী দেখা যাচ্ছে, এই প্রজন্মের মেয়েদের বয়ঃসন্ধিকালে প্রবেশের গড় বয়স আগের শতাব্দীর তুলনায় বেশ কমে গেছে। আবার কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে সেক্সটিং বা ডিজিটাল মাধ্যমে ব্যক্তিগত মেসেজ আদান-প্রদানের প্রবণতা বেড়েছে, যা ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ও জেনারেশন জেড (Gen Z) এর সময় সাময়িকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ও জেনারেশন জেড (Gen Z) এর এই পর্যায়টি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে আমরা প্রযুক্তির ওপর কতটা নির্ভরশীল। কিন্তু একই সাথে, এই অভয় প্রজন্ম প্রমাণ করেছে যে, দরকার হলে তারা ইন্টারনেট ছাড়াই রাজপথে, মাঠে কিংবা সমাজে শক্ত হাতে নিজেদের অধিকার আদায় করতে পারে এবং সংগঠিত হতে পারে। নস্টালজিয়া বা পুরোনো স্মৃতি হাতড়ে বেড়ানো এই প্রজন্মের যুব সংস্কৃতি হয়তো কখনো শেষ হবে না, বরং নতুন এক ইতিহাস তৈরি করবে।
আপনার জন্য একটি ছোট্ট কাজ :
বন্ধুরা, আপনারা যারা এই লেখাটি পড়ছেন, আপনাদের কি কখনো এমন মনে হয়েছে যে ইন্টারনেট ছাড়া জীবন একেবারেই অচল? নাকি ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের ওই কয়েকটা দিন আপনাদের পরিবার বা নিজের সাথে কাটানো সেরা সময়গুলোর একটি ছিল? ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ও জেনারেশন জেড (Gen Z) নিয়ে আপনার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বা মতামত কী? এখনই নিচে কমেন্ট বক্সে আমাদের সাথে শেয়ার করুন! আপনার একটি কমেন্ট হয়তো অন্য কাউকে নতুন কিছু ভাবতে সাহায্য করবে। আর হ্যাঁ, লেখাটি ভালো লাগলে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না!


