ভয়ংকর ও রোমাঞ্চকর! ফুটবল বিশ্বকাপের কলঙ্কিত অধ্যায়: যা আজও বিশ্বকে চমকে দেয়
আপনি কি কেবল ফুটবলের সুন্দর রূপটিই দেখেছেন? সুন্দর এই খেলার পেছনের অন্ধকার গল্পগুলো কি আপনার জানা আছে? আজ আমরা ফিরে তাকাবো সেই সব অদ্ভুত ও অবিশ্বাস্য ঘটনার দিকে। ফুটবল বিশ্বকাপের কলঙ্কিত অধ্যায়: নিয়ে সাজানো আমাদের এই বিশেষ প্রতিবেদন আপনাকে নিয়ে যাবে ফুটবলের সেইসব রোমাঞ্চকর ও বিতর্কিত মুহূর্তে, যা আজও কোটি কোটি ভক্তের মনে দাগ কেটে আছে।
আপনি কি কখনো ভেবেছেন, যে ফুটবল খেলা দেখে আমরা আনন্দে লাফিয়ে উঠি, উত্তেজনায় হাতের নখ কামড়াই কিংবা প্রিয় দলের হারে অঝোরে কাঁদি, সেই ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চেও কখনো কখনো ঘটে গেছে এমন কিছু ঘটনা যা স্রেফ গুন্ডামি বা নাটকীয়তাকেও হার মানায়? হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন। বিশ্বকাপের ট্রফি জেতার নেশা মাঝে মাঝে খেলোয়াড়দের এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যায়, যেখানে হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে পড়ে তারা।
আমাদের বাংলাদেশে ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই এক উৎসবের নাম। বিশ্বকাপ এলেই প্রতিটি পাড়ায়, প্রতিটি মহল্লায়, এমনকি চায়ের দোকানের আড্ডায় শুরু হয়ে যায় ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা বা অন্যান্য দল নিয়ে উন্মাদনা। বাড়ির ছাদে পতাকার লড়াই থেকে শুরু করে যুক্তির লড়াই—সবকিছুতেই থাকে এক অদ্ভুত আবেগ। কিন্তু এই আবেগের পেছনের ইতিহাস সবসময় সুন্দর নয়। ফুটবলের দীর্ঘ ইতিহাসে এমন কিছু ঘটনা রয়েছে, যা আজও ভক্তদের মনে বিস্ময় জাগায়। যখনই আমরা পেছন ফিরে তাকাই, তখন ফুটবল বিশ্বকাপের কলঙ্কিত অধ্যায়: আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মাঠে জয়ের নেশায় মানুষ কতটা মরিয়া হয়ে উঠতে পারে। চলুন, একজন সত্যিকারের ফুটবল ভক্ত হিসেবে আজ আমরা সেই সব বিতর্কিত ও গা শিউরে ওঠা ঘটনাগুলোর গভীরে প্রবেশ করি।
ফুটবল বিশ্বকাপের কলঙ্কিত অধ্যায়: ম্যারাডোনার সেই ‘হ্যান্ড অফ গড’
দিয়াগো ম্যারাডোনা—ফুটবল বিশ্বের এক জাদুকর। তার পায়ের জাদুতে মুগ্ধ হয়নি এমন ফুটবল ভক্ত পৃথিবীতে খুঁজে পাওয়া কঠিন। কিন্তু ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে তিনি এমন এক কাণ্ড ঘটিয়েছিলেন, যা আজীবন ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিতর্ক হিসেবে রয়ে গেছে। ইংল্যান্ড এবং আর্জেন্টিনার মধ্যকার সেই শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচের প্রথমার্ধ গোলশূন্য থাকার পর, দ্বিতীয়ার্ধের ৬ মিনিটের মাথায় ঘটে সেই অবিশ্বাস্য ঘটনা।
ইংল্যান্ডের ডি-বক্সের ভেতর উড়ে আসা একটি বল জালে জড়ানোর জন্য লাফিয়ে ওঠেন ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক পিটার শিল্টন এবং ম্যারাডোনা। পিটার শিল্টনের চেয়ে উচ্চতায় ৮ ইঞ্চি খাটো হওয়া সত্ত্বেও ম্যারাডোনা হেড করে বল জালে জড়ান! কিন্তু রিপ্লেতে পুরো বিশ্ব অবাক হয়ে দেখে, ম্যারাডোনা মাথা দিয়ে নয়, বরং হাত দিয়ে বলটি জালে পাঠিয়েছেন। রেফারি বা লাইন্সম্যান কেউই এই ঘটনা দেখতে পাননি। ম্যারাডোনার এই ‘হ্যান্ড অফ গড’ বা ঈশ্বরের হাতের গোলটি আজীবন ফুটবল বিশ্বকাপের কলঙ্কিত অধ্যায়: এর তালিকায় সবচেয়ে ওপরের দিকে অবস্থান করবে।
জিদানের সেই অভাবনীয় হেডবাট ও লাল কার্ড
২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপ ফাইনাল। ফ্রান্স বনাম ইতালির সেই মহাকাব্যিক লড়াই। জিনেদিন জিদান, যিনি ১৯৯৮ সালে ফ্রান্সকে বিশ্বকাপ জিতিয়েছিলেন, তিনি তার ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচটি খেলছিলেন। পুরো টুর্নামেন্টে জাদুকরী পারফরম্যান্স করে তিনি একাই ফ্রান্সকে ফাইনালে নিয়ে এসেছিলেন। প্রথমার্ধেই পেনাল্টি থেকে গোল করে দলকে এগিয়ে নেন জিদান, যদিও একটু পরেই মাতেরাজ্জির গোলে সমতায় ফেরে ইতালি।
ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। গোটা বিশ্ব যখন জিদানের হাতে ট্রফি দেখার অপেক্ষায়, ঠিক তখনই ১০৭ মিনিটে ঘটে এক অকল্পনীয় ঘটনা। ইতালির ডিফেন্ডার মার্কো মাতেরাজ্জির সাথে বাক্য বিনিময়ের এক পর্যায়ে জিদান হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে মাতেরাজ্জির বুকে সজোরে মাথা দিয়ে আঘাত (হেডবাট) করেন! রেফারি সরাসরি লাল কার্ড দেখান জিদানকে। মাথা নিচু করে বিশ্বকাপ ট্রফির পাশ দিয়ে জিদানের মাঠ ছাড়ার সেই দৃশ্য আজও ফ্রান্স সমর্থকদের কাঁদায়। এই ঘটনাটি শুধু জিদানের ক্যারিয়ারের জন্যই নয়, বরং ফুটবল বিশ্বকাপের কলঙ্কিত অধ্যায়: হিসেবে ক্রীড়া বিশ্বের ইতিহাসে চিরকাল একটি বড় ট্র্যাজেডি হয়ে থাকবে।
লুইস সুয়ারেজের সেই বিতর্কিত হ্যান্ডবল
২০১০ সালের সাউথ আফ্রিকা বিশ্বকাপের কথা আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে? সেইবার প্রথমবারের মতো আফ্রিকার কোনো দেশ হিসেবে ঘানা সেমিফাইনালের দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছিল। কোয়ার্টার ফাইনালে উরুগুয়ের বিপক্ষে ঘানার সেই ম্যাচটি ছিল আবেগে ভরপুর। নির্ধারিত সময়ের খেলা ১-১ গোলে শেষ হওয়ার পর অতিরিক্ত সময়ের একদম শেষ মুহূর্তে ঘানার স্ট্রাইকার ডমিনিক আদিয়াসের একটি নিশ্চিত হেড থেকে বল যখন গোললাইন অতিক্রম করছিল, তখন উরুগুয়ের স্ট্রাইকার লুইস সুয়ারেজ ইচ্ছাকৃতভাবে হাত দিয়ে বলটি ঠেকিয়ে দেন!
রেফারি তাকে সরাসরি লাল কার্ড দেখান এবং ঘানাকে পেনাল্টি দেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, ঘানার খেলোয়াড় আসামোয়া জিয়ান পেনাল্টি থেকে গোল করতে ব্যর্থ হন এবং পরে টাইব্রেকারে উরুগুয়েশ্চের কাছে হেরে বিদায় নেয় ঘানা। মাঠের বাইরে সুয়ারেজের বুনো উল্লাস আফ্রিকান সমর্থকদের হৃদয় ভেঙে দিয়েছিল। এই স্বার্থপর কিন্তু কার্যকরী সিদ্ধান্তটি ফুটবল বিশ্বকাপের কলঙ্কিত অধ্যায়: এর অন্যতম একটি নিষ্ঠুর দৃষ্টান্ত।
ব্যাটেল অফ সান্তিয়াগো: ফুটবল নাকি কুস্তি খেলা?
আমরা ফুটবলকে শিল্পের সাথে তুলনা করি, কিন্তু ১৯৬২ সালের চিলি বিশ্বকাপে ইতালি ও স্বাগতিক চিলির মধ্যকার ম্যাচটি ছিল আক্ষরিক অর্থেই একটি যুদ্ধক্ষেত্র! এই ম্যাচটিকে অনেকেই ‘ব্যাটেল অফ সান্তিয়াগো’ বলে ডাকেন। মাঠে ফুটবল খেলার চেয়ে ফ্লাইং কিক, কিল-ঘুষি এবং হাতাহাতিই বেশি হয়েছিল।
খেলোয়াড়দের সামলাতে রেফারিকে তিনবার পুলিশের সাহায্য নিতে হয়েছিল! এমনকি ম্যাচ শেষে ইতালি দলকে পুলিশের কঠোর পাহারায় মাঠ থেকে বের হতে হয়। ম্যাচের রেফারি লিও হর্ন আক্ষেপ করে বলেছিলেন যে তিনি কোনো ফুটবল ম্যাচ পরিচালনা করছিলেন না, বরং সামরিক মহড়ার আম্পায়ার হিসেবে কাজ করছিলেন। ফুটবলের ময়দানকে এমন রণক্ষেত্রে পরিণত করার এই ঘটনা ফুটবল বিশ্বকাপের কলঙ্কিত অধ্যায়: হিসেবে ফুটবলের স্পিরিটকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল।
২০০৬ সালের নেদারল্যান্ড বনাম পর্তুগাল: কার্ডের ছড়াছড়ি
২০০৬ বিশ্বকাপে রাউন্ড অফ সিক্সটিন-এর ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল নেদারল্যান্ড ও পর্তুগাল। দুই দলেরই সুন্দর ও আক্রমণাত্মক ফুটবলের জন্য দারুণ সুনাম ছিল। কিন্তু সেই দিন মাঠে যা ঘটেছিল, তা ছিল চরম লজ্জাজনক। একে অপরকে ফাউল করার এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠে দুই দলের খেলোয়াড়রা।
রাশিয়ান রেফারি ভ্যালেন্টিন ইভানভ পুরো ম্যাচে মোট ১৬টি হলুদ কার্ড এবং ৪টি লাল কার্ড দেখাতে বাধ্য হন! এই ম্যাচটিকে ফুটবলের ইতিহাসে ‘ব্যাটেল অফ নুরেমবার্গ’ বলা হয়। ফিফা প্রেসিডেন্ট সেপ ব্ল্যাটার ক্ষুব্ধ হয়ে বলেছিলেন যে রেফারির নিজের নিজেকেই হলুদ কার্ড দেখানো উচিত ছিল। ফেয়ার প্লের বড় বড় বুলি আওড়ানো দলগুলোর এমন উগ্র রূপ ফুটবল বিশ্বকাপের কলঙ্কিত অধ্যায়: এর পাতায় এক স্থায়ী কালিমা লেপে দিয়েছে।
১৯৮২ বিশ্বকাপে গ্যালারি থেকে মাঠে কুয়েতের প্রেসিডেন্ট!
১৯৮২ সালের স্পেন বিশ্বকাপে ঘটেছিল আরেক হাস্যকর ও বিতর্কিত ঘটনা। ফ্রান্স বনাম কুয়েতের ম্যাচে ফরাসি খেলোয়াড় অ্যালেইন গিরেসে একটি গোল করেন। কিন্তু কুয়েতের খেলোয়াড়দের দাবি ছিল, তারা গ্যালারি থেকে আসা বাঁশির শব্দ শুনে খেলা থামিয়ে দিয়েছিলেন, আর সেই সুযোগেই ফ্রান্স গোলটি করে।
রেফারি গোল বাতিল না করায়, গ্যালারিতে বসে থাকা কুয়েত ফুটবল ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট শেখ ফাহাদ আল-আহমাদ আল-সাবাহ খেলোয়াড়দের মাঠ ছেড়ে চলে আসার নির্দেশ দেন। এরপর তিনি নিজেই গ্যালারি থেকে মাঠে নেমে রেফারির সাথে তর্কে জড়িয়ে পড়েন! অদ্ভুত ব্যাপার হলো, দীর্ঘ বিতর্কের পর রেফারি সেই গোলটি বাতিল করতে বাধ্য হন। ফিফার ইতিহাসে এরকম সরাসরি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ ফুটবল বিশ্বকাপের কলঙ্কিত অধ্যায়: এর একটি নজিরবিহীন ঘটনা, যার ফলে রেফারিকে আজীবনের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।
১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনার সেই বিতর্কিত জয়
১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল আর্জেন্টিনায়, যেখানে তখন সামরিক জান্তার শাসন চলছিল। ফাইনালে ওঠার জন্য দ্বিতীয় রাউন্ডের শেষ ম্যাচে পেরুর বিপক্ষে আর্জেন্টিনার অন্তত ৪-০ গোলের ব্যবধানে জয়ের প্রয়োজন ছিল। ফুটবল বিশ্বের সবাই অবাক হয়ে দেখল, আর্জেন্টিনা সেই ম্যাচে পেরুকে ৬-০ গোলে বিধ্বস্ত করে ফাইনালে উঠে গেল!
ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে পেরুর খেলোয়াড়দের রহস্যজনকভাবে খেই হারিয়ে ফেলা এবং অদ্ভুত বডি ল্যাঙ্গুয়েজ অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়। পরবর্তীতে গুজব রটে যে, সামরিক জান্তার হুমকি কিংবা বিশাল অঙ্কের অর্থনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে পেরু ইচ্ছাকৃতভাবে ম্যাচটি হেরে গিয়েছিল। যদিও এর কোনো শক্ত প্রমাণ মেলেনি, তবু জয়ের জন্য এই ধরনের পর্দার পেছনের কলকাঠি নাড়ার অভিযোগ ফুটবল বিশ্বকাপের কলঙ্কিত অধ্যায়: এর ইতিহাসে আজও এক অমীমাংসিত রহস্য হয়ে আছে।
শত বিতর্ক, হতাশা আর সমালোচনা থাকলেও ফুটবল বিশ্বকাপের প্রতি আমাদের ভালোবাসা এতটুকুও কমেনি। প্রতিটি চার বছর পর পর আমরা সব ভুলে আবার নতুন স্বপ্নে বুক বাঁধি। তবে ফুটবলের এই সুন্দর ইতিহাস যেমন আমাদের গর্বিত করে, তেমনি এই বিতর্কিত মুহূর্তগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আবেগ আর প্রতিযোগিতার মিশেলে মানুষ কত দূর যেতে পারে।
আপনার মতামত আমাদের জানান! (Call to Action) প্রিয় ফুটবল ভক্তরা, আপনি কি মনে করেন লুইস সুয়ারেজ ঘানার বিপক্ষে যা করেছিলেন তা দেশের স্বার্থে সঠিক ছিল? নাকি ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অফ গড’ গোলটির জন্য ফুটবলের ক্ষমা চাওয়া উচিত? এই ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোর মধ্যে কোনটি আপনার কাছে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বা অবাক করার মতো মনে হয়েছে?
দেরি না করে এখনই নিচে কমেন্ট বক্সে আপনার মহামূল্যবান মতামত আমাদের সাথে শেয়ার করুন! আপনার বন্ধুদের সাথে এই রোমাঞ্চকর আর্টিকেলটি শেয়ার করে তাদেরও জানিয়ে দিন ফুটবলের পেছনের এই অজানা সত্যগুলো। ফুটবল এবং অন্যান্য খেলার এমন সব আকর্ষণীয় ও অজানা গল্প সবার আগে পেতে আমাদের ওয়েবসাইটে সাবস্ক্রাইব করুন এবং সবসময় আপডেট থাকুন!

