১১২ জন শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু ও জুলাই বিপ্লবের অজানা গল্প: অবিশ্বাস্য ২৪ এর গণঅভ্যুত্থান!
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ১১২ জন শ্রমিকের প্রাণহানি ঘটেছে, যা আমাদের অনেকেরই অজানা। নতুন বাংলাদেশে শ্রমিক অধিকার আদায়ের এই জুলাই বিপ্লবের অজানা গল্প আপনার হৃদয়কে নাড়িয়ে দেবে।
আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন, গত জুলাই-আগস্টের সেই উত্তাল দিনগুলোতে যারা রাজপথে বুক পেতে দিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে কতজন ছিলেন সাধারণ দিনমজুর বা রিকশাচালক? আমরা হয়তো টিভিতে বড় বড় নাম দেখি, কিন্তু পর্দার আড়ালে থাকা সেই সব মানুষের ত্যাগের কথা কি আমরা জানি? ২০২৪ সালের সেই রক্তঝরা দিনগুলোতে শত শত সাধারণ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, যার একটি বড় অংশই ছিলেন আমাদের দেশের মেরুদণ্ড—শ্রমিক সমাজ। আজ আমরা জানব সেই অবহেলিত মানুষের বীরত্বগাথা এবং জুলাই বিপ্লবের অজানা গল্প, যা আপনাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শ্রমিকদের অনেক বড় মূল্য দিতে হয়েছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই আন্দোলনে অন্তত ১১২ জন শ্রমিক নিহত হয়েছেন। আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী শ্রমিকের সংখ্যা কয়েক হাজার। নিহতদের মধ্যে ২১ জন দোকানদার, ১৫ জন রিকশাচালক, ১২ জন পরিবহনকর্মী, ৯ জন পোশাক শ্রমিক, ৯ জন দিনমজুর এবং ৬ জন ছিলেন নির্মাণশ্রমিক। সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, নিহতদের মধ্যে ২৩ জনই ছিল শিশুশ্রমিক, যাদের বয়স ছিল মাত্র ১৩ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। এই সংখ্যাগুলোই বলে দেয়, আমাদের স্বাধীনতা অর্জনে শ্রমিকদের অবদান কতটা গভীর।
২৪ এর গণঅভ্যুত্থান ও শ্রমিকদের অবিশ্বাস্য ত্যাগের ইতিহাস
আমরা যখন ২৪ এর গণঅভ্যুত্থান নিয়ে আলোচনা করি, তখন ছাত্র-জনতার পাশাপাশি শ্রমিকদের এই বীরত্বগাথা সবসময়ই সামনে আসা উচিত। রাজপথের প্রথম সারিতে দাঁড়িয়ে যারা পুলিশের বুলেটকে ভয় পায়নি, তারা ছিল এই খেটে খাওয়া মানুষগুলো। তাদের এই অবিশ্বাস্য আত্মত্যাগ যেন কোনোভাবেই বৃথা না যায়, সেটাই এখন দেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিকের প্রত্যাশা। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও শ্রমিক অধিকার কর্মীদের মতে, ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে শ্রমিকদের এই রক্ত যেন বিফলে না যায় এবং তাদের অধিকার যেন সাংবিধানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়।
জুলাই বিপ্লবের অজানা গল্প: শ্রম সংস্কার ও নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন
শ্রমিকদের এই আত্মত্যাগকে সার্থক করতে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সহকারী সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা বলেছেন। তিনি মনে করেন, সরকারের উচিত শ্রম সংস্কার কমিশনের দেওয়া ২৫টি সুপারিশ দ্রুত বাস্তবায়ন করা। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এ দেশের ৮৫ শতাংশ শ্রমিকই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন, যাদের কোনো আইনি স্বীকৃতি নেই। এই শ্রমিকদের সামাজিক স্বীকৃতি ও নিবন্ধন দেওয়া এখন সময়ের দাবি।
যখন আমরা জুলাই বিপ্লবের অজানা গল্প নিয়ে কথা বলি, তখন মজুরি বৈষম্য দূর করা এবং ট্রেড ইউনিয়ন স্থাপনের অধিকারের বিষয়টি সবার আগে আসে। কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নারী শ্রমিকদের জন্য মাতৃত্বকালীন ৬ মাস ছুটি কার্যকর করাও অত্যন্ত জরুরি। শ্রমিকদের ঘাম আর রক্তে দেশের উন্নয়ন হবে, কিন্তু শ্রমিকরা অবহেলিত থাকবে—এমন বৈষম্যমূলক সমাজ আর কেউ চায় না।
জুলাই অভ্যুত্থান ২০২৪: শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ করার উপায়
জুলাই অভ্যুত্থান ২০২৪ আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে উঠতে হয়। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান এই অভ্যুত্থানে শ্রমিক হত্যার দায়ে শেখ হাসিনার বিচার দাবি করেছেন। তিনি মনে করেন, নারী শ্রমিকদের সুবিধার্থে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে ডে-কেয়ার সেন্টার থাকা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। এছাড়া বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানাগুলো চালু করে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করা এবং আউটসোর্সিং প্রথা বন্ধ করে স্থায়ী পদ সৃষ্টি করার দাবিও উঠেছে।
শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে জাতীয়ভাবে ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা ঘোষণা করা এবং একটি বৈষম্যহীন জাতীয় পে-স্কেল তৈরি করা এখন অপরিহার্য। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমিয়ে শ্রমিকদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনা না গেলে তাদের এই আত্মত্যাগ অপূর্ণ থেকে যাবে। ভবিষ্যতের প্রজন্মের কাছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ২০২৪ রচনা যখন তুলে ধরা হবে, তখন যেন সেখানে এই অর্থনৈতিক মুক্তির কথাগুলোও গুরুত্ব পায়।
নারী শ্রমিকদের লড়াই ও জুলাই বিপ্লবের অজানা গল্প
গণসংহতি আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিষদের নেতা তাসলিমা আখতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, অভ্যুত্থানের প্রথম এবং প্রধান দাবি ছিল ‘শ্রমিকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা’। গত ১৫ বছর ধরে শ্রমিকরা তাদের মনের কথা বলতে পারেননি, প্রতিবাদ করতে পারেননি। তাই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে শ্রমিকদের প্রধান প্রত্যাশা ছিল কথা বলার একটি সুন্দর পরিবেশ।
আমাদের দেশের ৮ কোটি শ্রমিকের মধ্যে একটি বিশাল অংশ নারী। অথচ নারী ও পুরুষ শ্রমিকদের মধ্যে আজও মজুরি বৈষম্য আকাশচুম্বী। বিশেষ করে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত নারীরা ভয়াবহভাবে এই বৈষম্যের শিকার। যৌন হয়রানিসহ সব ধরনের হয়রানি বন্ধ করে নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন অধরা থেকে যাবে। এই নীরব বঞ্চনার গল্পগুলোই হলো আসল জুলাই বিপ্লবের অজানা গল্প।
রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতির পথে জুলাই অভ্যুত্থান ২০২৪
জাতীয় নাগরিক পার্টির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব মনে করেন, বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত প্রকৃত ‘রাষ্ট্র’ হিসেবে গড়ে ওঠেনি। কারণ রাষ্ট্র তখনই পূর্ণতা পায়, যখন সে তার সব নাগরিকের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করে। আমাদের দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এখনো শ্রমিকবান্ধব নয়; রাজনৈতিক দলগুলো শ্রমিকদের কেবল ক্ষমতার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করে।
আজও দেশের ৮০ শতাংশ শ্রমিকের পেশার কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নেই। শহীদ শ্রমিকদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া এবং সেক্টরভিত্তিক ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা এখন সময়ের দাবি। এছাড়াও সামাজিকভাবে শ্রমিকদের প্রতি যে ঘৃণা বা তুচ্ছতাচ্ছিল্য প্রদর্শন করা হয়, তা বন্ধ করতে হবে। কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের ‘তুই’ বা ‘তুমি’ না বলে ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করার মাধ্যমে তাদের প্রাপ্য মর্যাদা দিতে হবে। এই মানসিক পরিবর্তনই হবে জুলাই অভ্যুত্থান ২০২৪ এর অন্যতম বড় সফলতা।
উপসংহার ও আমাদের দায়বদ্ধতা
বন্ধুরা, এই রক্তঝরা ইতিহাস আমাদের কেবল শোক করতে শেখায় না, বরং লড়তে শেখায়। জুলাই বিপ্লবের অজানা গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, এ দেশ কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, এ দেশ রিকশাচালক থেকে শুরু করে গার্মেন্টস কর্মীর—সবার। তাই আসুন, আমরা সবাই মিলে এমন এক বাংলাদেশ গড়ি যেখানে শ্রমিকের অধিকার আদায়ের জন্য কাউকে আর প্রাণ দিতে হবে না।
শহীদ শ্রমিকদের রক্তের ঋণ শোধ করতে হলে আমাদের এখনই সচেতন হতে হবে। আপনার আশেপাশে থাকা শ্রমিক ভাই-বোনদের সম্মান করুন এবং তাদের নায্য পাওনা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখুন।
আপনি কি মনে করেন ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরি এই মুহূর্তে শ্রমিকদের জন্য যথেষ্ট? নাকি তাদের জীবনমান উন্নয়নে আরও বৈপ্লবিক পরিবর্তনের প্রয়োজন? আপনার মূল্যবান মতামত নিচে কমেন্ট করে আমাদের জানান এবং এই সত্য গল্পটি সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে আর্টিকেলটি এখনই শেয়ার করুন!


